দীর্ঘ ৫৩ বছরের শাসনের পর আকস্মিকভাবে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের পতন হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ রাশিয়ায় পালিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন।
আধুনিক যুগের সবচেয়ে নৃশংস সরকারের শেষটা হয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের ১২তম দিনে। এর সঙ্গে সমাপ্তি ঘটেছে দেশটির ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের।
এক যুগের বেশি সময় চলা এ গৃহযুদ্ধে সাড়ে ৩ লাখ সিরীয় নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ কোটি ৩০ লাখ। এ ছাড়া প্রায় ৬ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্ত শুরুর পর এর প্রভাব পড়ে সিরিয়ায়ও।
দেশটির সাধারণ মানুষ বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করেন। কিন্তু আসাদ এ বিক্ষোভ কঠোর হস্তে দমন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেধে যায় গৃহযুদ্ধ।
যা দ্রুত আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হয়। এতে যুক্ত হয় রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলো।
বাশারের পতনের মাধ্যমে এই পরাশক্তিগুলোর মধ্যে কার জয় হলো আর কার পরাজয় হলো, সেগুলো নিয়ে এখন চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত রাশিয়া ও ইরানের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, জয়ী হয়েছে তুরস্ক। ইসরায়েলও আসাদের পতনে খুশি হয়েছে। তবে সঙ্গে তারা সতর্ক অবস্থানে আছে। ইসরায়েলের শঙ্কা,
ক্ষমতা দখল করা ইসলামপন্থি দল হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরও সহানুভূতি দেখাতে পারে। এ কারণে আসাদের পতনের পরই সিরিয়ায় তারা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে।
যেন বিদ্রোহীরা এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে যখন বিক্ষোভ শুরু হয়। তখন ইরান বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। কারণ,
সিরিয়া তাদের অন্যতম বড় ও পুরোনো মিত্র। ইরানের আশঙ্কা ছিল, এই মিত্রকে হারালে ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে।
তারা লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে সিরীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে আর অস্ত্র পাঠাতে পারবে না।
এ কারণে আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অস্ত্র সহায়তার পাশাপাশি বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার এবং হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের সরাসরি সিরিয়ায় পাঠায় তেহরান।
তা সত্ত্বেও ২০১৫ সালের দিকে আসাদের পতন হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। ওই সময় ইরান সহায়তার জন্য রাশিয়াকে অনুরোধ জানায়।
এতে সাড়া দিয়ে সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালায় রাশিয়া।
এসব হামলায় টিকে থাকতে না পেরে বিদ্রোহীরা একের পর এক শহর ছেড়ে চলে যায়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, আসাদ টিকে যাবেন।
কিন্তু সেটি আর শেষ পর্যন্ত হয়নি। তবে বাশারকে রক্ষা করতে এসে সিরিয়ায় নিজেদের দুটি ঘাঁটি তৈরি করে রাশিয়া।
এ বিষয়টি ভূমধ্যসাগরের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে। যদিও আসাদকে শেষ রক্ষা করতে না পারায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরাশক্তি হিসেবে তাদের অবস্থান ক্ষুণ্ন হয়েছে।
আসাদের পতনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে তুরস্ক। দেশটি এখন এমন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব খাটাতে পারবে,
সেটি সিরিয়ার মাধ্যমে গালফ অঞ্চল এবং ইউরোপকে সংযুক্ত করেছে। আসাদের পতনকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। উভয়েই বিষয়টিকে তাদের শত্রু ইরান
ও রাশিয়ার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে। ইউরোপের দেশগুলো বিশেষ খুশি, কারণ সিরিয়ার যেসব শরণার্থী গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা আবারও নিজ দেশে
ফিরে যাবেন বলে আশা তাদের।
