
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত উমাইয়া জামে মসজিদে আগমন করবেন। বর্তমান বিশ্বে যে কয়টি প্রাচীন ইসলামি স্থাপত্য আদি অবকাঠামোর ওপর এখনও টিকে আছে তার মধ্যে অন্যতম এটি। এর বয়স ১৩০০ বছরের বেশি। এ মসজিদকে ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম পথিকৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কেয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে পৃথিবীতে ঈসা (আ.)-এর পুনর্বার আগমন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ঈসার পুনরায় দুনিয়ায় আগমন কেয়ামতের একটি নিশ্চিত নিদর্শন’ (সুরা জুখরুফ : ৬১)। মিরাজের রাতে হজরত মুহাম্মদ (সা.) চতুর্থ আসমানে হজরত ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হজরত ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি আমাকে বললেন, কেয়ামত কবে সংঘটিত হবে তা তো আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
তবে তিনি আমাকে এটা জানিয়েছেন, কেয়ামতের পূর্বে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। তখন আমি পৃথিবীতে অবতরণ করে দাজ্জালকে হত্যা করব’ (ইবনে মাজা : ৪০৮১)। আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) দাজ্জালের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘দাজ্জাল যখন মুসলমানদের ঈমান ধ্বংসের কাজে লিপ্ত থাকবে আল্লাহ তায়ালা তখন ঈসা ইবনে মারিয়ামকে (আ.) পাঠাবেন। জাফরানের রঙ্গে রঙিন এক জোড়া পোশাক পরিহিত হয়ে এবং দুজন ফেরেশতার পাখার ওপর হাত রেখে দামেস্ক শহরের পূর্বে অবস্থিত সাদা মিনারের ওপর তিনি অবতরণ করবেন’ (মুসলিম : ২৯৩৭)। তিনি ফজরের নামাজের সময় যখন তাকবিরে উলা বলা হয়ে যাবে তখন অবতরণ করবেন।
নামাজের জন্য প্রথম কাতারে দাঁড়াবেন। দায়িত্বরত মুসলিম ইমাম (ইমাম মাহদি) তখন শ্রদ্ধাভরে অনুরোধ করবেন, হে রুহুল্লাহ, আসুন, আমাদের ইমামতি করুন। তিনি বলবেন, না, তোমরা বরং একে অন্যের আমির। এটিই সেই সম্মান, যা আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে দান করেছেন।’ (মুসলিম: ১৫৬)
মসজিদ নির্মাণের হাজার বছর আগে থেকে বিভিন্ন দেবতার উপাসনা করা হতো এখানে। দীর্ঘকাল ধরে এখানে ছিল রোমনাদের জুপিটার মন্দির। পরে ৩৯১ সালে জুপিটার মন্দিরকে খ্রিস্টান চার্চে পরিণত করা হয়। পরে এ চার্চ হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর নামে উৎসর্গ করা হয়।
প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান উপাসনালয় এবং পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণের পরে এখানে থাকা অনেক মূল্যবান প্রত্ন নিদর্শন বর্তমানে সিরিয়ার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ৬৩৪ সালে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে দামেস্ক জয় হয়। ৬৬১ সালে ইসলামি খেলাফত উমাইয়া বংশের অধীনে আসে। এরপর দামেস্ক হয় মুসলিম বিশ্বের প্রশাসনিক রাজধানী। ষষ্ঠ উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদ ৭০৫ সালে এখানে মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
পারস্য ইতিহাসবিদ ইবনে ফকিহ লিখেছেন, ৭০৫ সালে মসজিদ নির্মাণ শুরুর পর খননের সময় এর নিচে একটি গোপন বাক্সে রক্ষিত একটি মস্তক পাওয়া যায়। এ মস্তক হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর বলে বিশ্বাস। খলিফা প্রথম ওয়ালিদ এটি জানার পর তিনি মস্তকটি মসজিদের মধ্যে সমাহিত করে তার ওপর একটি বিশেষ পিলার নির্মাণের নির্দেশ দেন। পরে এ স্থানে মাজার ও গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-কে খ্রিস্টানরাও তাদের নবী দাবি করে।
সে কারণে এ মসজিদ খ্রিস্টানদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া আগে থেকেই এখানে ছিল তাদের চার্চ। এ মসজিদ যখন নির্মাণ করা হয় তখন এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। ভারত, ইরান, গ্রিস ও মরক্কো থেকে ১২ হাজার দক্ষ কারিগর সংগ্রহ করা হয় এর স্থাপত্যশৈলীর জন্য।
এ ছাড়া বাইজানটাইন কারিগরদের নিয়োজিত করা হয় এর মোজাইকের কাজে। ৭১৫ সালে শেষ হয়
মসজিদ নির্মাণ। ১৩০০ বছর পার হলেও এখনও এ মসজিদের আদি অলঙ্করণ এবং সাজসজ্জা অমলীন যা মুগ্ধ করে দর্শকদের। এ মসজিদ সিরিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান।