অবশেষে দীর্ঘ ৪০ বছর আদালতে আইনি লড়াইয়ের পর মামলায় জয় পেয়েছেন অশতীপর হরেন্দ্রনাথ চন্দ্র। সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করায় হরেন্দ্রনাথকে মামলা পরিচালনার খরচ হিসেবে ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ সোমবার সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা লিভ টু আপিল খারিজ করে এই রায় দেন। সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আগামী তিন মাসের মধ্যে হরেন্দ্রনাথ চন্দ্রকে এই টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।
‘আদালতের বারান্দায় হরেন্দ্রের ৪০ বছর’ শিরোনামে গত ৫ নভেম্বর সমকালে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর সর্বোচ্চ আদালতের নজরে আসে বিষয়টি। গত এক মাস ধরে মামলাটি একাধিকবার আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় পিছনের দিকে থাকলেও শুনানি হয়নি। সোমবার সকালে এ মামলায় হরেন্দ্রনাথের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক আপিল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর দুপুরে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রায় দিয়ে লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করেন। এ সময় সোনালী ব্যাংকের পক্ষের ছিলেন আইনজীবী মাসুদ রেজা সোবহান।
রায়ের পর বিনা ফিতে মামলা পরিচালনাকারী হরেন্দ্রনাথের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক সমকালকে বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে মামলা সংক্রান্ত খরচ বাবদ ২০ লাখ টাকা হরেন্দ্রনাথকে দিতে বলেছেন। আদালতের কাছে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলাম। তিনি বলেন, এ মামলার আদ্যোপান্ত আদালতকে জানিয়েছি। এরপর আপিল বিভাগ বিস্ময়প্রকাশক করেছেন। আদালত বলেছেন, এভাবে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ভুয়া মামলার সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে।
হরেন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় আবেগে কেঁদে ফেলেন হরেন্দ্রনাথ। সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আদালতের কাছে ন্যায় বিচার পেয়েছি। আমি খুব খুশী। আমার শেষ সম্বল পৈতিৃক ভিটা-বাড়ি ও ফসলি জমি বিক্রি করে ৪০ বছর ধরে মামলা চালিয়ে আসছি। আমি কোনো অন্যায় করিনি, অকারণে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা চালিয়েছে। রায়ে আদালত আমাকে ন্যায় বিচার দিয়েছেন। আমার মতো আর কাউকে যেন আদালতে ঘুরতে না হয়।
মামলার নথিপত্র অনুসারে, হরেন্দ্রনাথ চন্দ্র কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার হেলালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ৪০ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় সময় কাটিয়েছেন। ৪০ বছর আগে সোনালী ব্যাংকের ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। তবে আদালত তাকে খালাস দিলেও সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মামলা আপিল করে, যা দীর্ঘ চার দশক ধরে চলতে থাকে। অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ এই মামলা নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
হরেন্দ্রনাথ ১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সোনালী ব্যাংকে ক্যাশিয়ার-কাম ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র ক্যাশিয়ার-কাম ক্লার্ক হন। তাকে যাত্রাবাড়ী শাখায় বদলি করা হয়, যেখানে ১৬ লাখ ১৬ হাজার ১০০ টাকা স্থানান্তর করা হয়। তবে ১৯৮৫ সালে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওই টাকা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। এরপরেই হরেন্দ্রনাথসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপের অভিযোগে মামলা করা হয় এবং ১৯৮৬ সালে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
১৯৮৬ সালে আদালত গ্রাহকের টাকা জমা না দেওয়ার কারণে একজন কর্মকর্তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন, এবং অন্যদেরও বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। হরেন্দ্রনাথ ১৯৯০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান।
এছাড়া ১৯৮৫ সালে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হরেন্দ্রনাথসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ অভিযোগে ঢাকার বিশেষ আদালতে মামলা দায়ের করে, কিন্তু ১৯৮৬ সালে তাদের সবাইকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গোপনে ১৯৮৮ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে, যেখানে একতরফা রায় দিয়ে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং পুরো টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে, হরেন্দ্রনাথ মিস কেসের আবেদন করেন এবং ১৯৯২ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালত রায় বাতিল করেন।
